শুধু না ভেজে যেনো তোমার চোখ…



বর্ষার দুদিন হয়ে গেলো, অথচ আমার কলম কেমন স্থির, স্থবির হয়ে পড়ে আছে!


না, আমার কলমের যে ভীষণ রকম শক্তি আছে, সেই দাবি করার কোনোই কারণ নেই। তারপরও বর্ষা এলেই আমার কলমে একটা দুটো লেখা বেরিয়ে আসেই আসে।


কিন্তু এবার বর্ষায় সব কেমন অন্য রকম। বয়স বাড়ছে, টের পাচ্ছি। অনুভূতির প্রকাশও কেমন বদলে গেছে। বদলে গেছে আসলে অনুভূতিও। কী বলবো, কীভাবে বলবো— এখন এ রকম অনেক প্রশ্ন আসে মনে। অথচ আগে কেমন অবারিত বারিধারার মতো লিখে যেতাম। ছাইপাশ হলেও। 


গত কদিন ধরেই হুট করে বৃষ্টি চলে আসছে। আবার হুট করেই ঘাম ছোটানো রোদ। বর্ষায় প্রকৃতির এই রকম দোটানা তো আমার জানাই আছে। তারপরও এবার সব কেমন অন্য রকম। 


আদিমতার প্রতি মানুষের এক ধরনের তীব্র টান আছে, আর আমার কাছে বৃষ্টির চেয়ে আদিম কিছু নেই। বৃষ্টি এলেই তাই মনে হয় এই বর্ষণ চলুক বাকিটা জীবন ধরে। বৃষ্টির জলে মিশে আমি চলে যাই অন্য জীবনে, অন্য লোকে এবং অন্য বাস্তবতায়; যেখানে তুমি নেই, যেখানে তোমার প্রতি কোনো টান নেই, মান নেই, অভিমান নেই, রাগ নেই, অনুরাগ নেই, অভিযোগ নেই… তুমিসংক্রান্ত কিছুই নেই। 


কিন্তু তা কি আর হওয়ার? নাহ!


আমি তাই বৃষ্টি হলেই খুশি থাকি।


এক সময় তো বৃষ্টি মানে ছিলো টিনের চালে দিনভর ঝনঝন, ঝনঝন। কিন্তু এখন আর টিন নেই, টিনের চালের অতীতও প্রায় বিস্মৃত। 


এখনকার বৃষ্টি মানে জানলা দিয়ে চলে আসা সামান্য ছাট। কিংবা বারান্দার ফ্লোরে জমে থাকা পানি। আর যদি বৃষ্টির সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে সামান্য বাতাস থাকে, তাহলে জানলাটার মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দোল খাওয়া। 


আর যদি ভাগ্যক্রমে বাসার বাইরে থাকি, তাহলে জীবনের আরো একটু বেশি আঙিনাজুড়ে বৃষ্টির আগমন ঘটে। 


কবেকার কোন ১৫ই জুনে জীবন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এবার তা মনে পড়েছিলো। সে দিনও ঝিরঝিরে বৃষ্টি ছিলো মাথার উপর। সেই রকম বৃষ্টিমগ্ন দিনে তোমার সাথে কিভাবে কিভাবে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিলো।


তারপর কতো ১৫ই জুন চলে গেলো। কিন্তু সেই রকম বৃষ্টি আর আসেনি কখনো। 


সেই ১৫ই জুন ছিলো বর্ষার প্রথম দিন। এবারও তাই। গত কয়েক বছরে বারবার এমন হয়েছে। কিন্তু সেই রকম বৃষ্টি আর হয়নি। সেই ১৫ জুনের বৃষ্টি কি শুধু তোমার আর আমার জন্যই এসেছিলো?


কে জানে!


তুমি আর নেই। জীবনে ঘটেছে নতুন মানুষের আগমন। তোমারও। আমারও। 


তুমি সব গুছিয়ে নিয়েছো। আমি এখনো বোহেমিয়ান। নতুন যে মানুষের হাতে হাত রেখেছি, তার হাত থেকে আমি প্রতিদিন খসে পড়ি। কিন্তু সে টেরও পায় না! কী অদ্ভুত, তাই না? 


এই সগতোক্তির মতো এই যে কথা বলে যাচ্ছি, না তুমি শুনছো, না আমার নতুন তুমির কোনো খোঁজ আছে। 


তারপরও কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই বর্ষায় আকাশ যেমন ক্ষণে ক্ষণে মুখ ভারি করে রাখে, মনও তেমনই ভারি হয়ে আসে মাঝে মাঝে। যখন কিছু না বলতে পারলে দম বন্ধ লাগে। তাই এই কলম তুলে নেওয়া।


আমার কোনো কথাই আর তোমার কাছে পৌঁছায় না, জানি। আমারও ইচ্ছে করে না তোমাকে কিছু বলতে। তারপরও মাঝে মাঝে মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠলে তোমার দেওয়া অবহেলারা জেগে ওঠে। 


তোমার থেকে এক অনতিক্রম্য দূরত্বে দাঁড়িয়েও যেনো মুক্তি নেই আমার। কিংবা তোমারও… এবং এই ভেবে আমি যখন নতুন হাতটা শক্ত করে ধরি, যাকে আজকাল এক ও একমাত্র পৃথিবী মনে হয়; তখন সেও কেমন কিছু না বোঝা ও না জানার ভান করে পিঠ ঘুরিয়ে থাকে…


০২


আজকেও ঘুম ভাঙলো বৃষ্টির তানপুরা ছন্দে। 


যে পাশ ফিরে শুয়ে ছিলাম, ফোনটা ছিলো তার উল্টো দিকে। আধবোজা চোখে ফোনের দিকে তাকালাম, এই আশায় যে, হয়তো কোনো মিসড কল বা মেসেজ এসেছে। কিন্তু না, কোনো মেসেজ নয়, কোনো মিসড কলও নয়। 


অপেক্ষা না ফুরানোর কষ্টের বড় কোনো কষ্ট নেই। তারপরও আজকাল এই একটা কাজ নিয়েই যেনো বেঁচে আছি— অপেক্ষা এবং অপেক্ষা। 


এই অপেক্ষার শেষ কোথায়, আদৌ শেষ আছে কি না; তা আমি জানি না। অন্য অনেক না-জানার মধ্যে এই না-জানাই কখন যেনো অনিঃশেষ হয়ে উঠলো!


তোমার শহরেও এই রকম বৃষ্টি হয়?


কবে কোথায় যেনো পড়েছিলাম- পৃথিবীর কোনো বৃষ্টিই আসলে বর্ষার বৃষ্টির মতো উপভোগ্য নয়, আদিম নয়, সম্মোহনী শক্তির বাহক নয়। এই কথার সত্যাসত্যি যাচাই ছাড়াই আমি এই কথার ভক্ত। 


আমিও বিশ্বাস করি তোমার শহরের বৃষ্টি এ রকম নয়। তোমার শহরের বৃষ্টিতে বিরহ থাকে না, কান্না থাকে না, অপেক্ষা থাকে না। 


এই-ই যদি না থাকে, তাহলে বৃষ্টির আর থেকে কী লাভ! 


থেকেও যে খুব একটা লাভ আছে, সে রকমও নয়। এই বৃষ্টি শেষে তোমাকে দেখার জন্য কেমন অস্থির লাগে। কিন্তু… 


কথাবার্তা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে!


আমি বরং বৃষ্টি দেখি আর বলি… 


সারা বছর ধরে বৃষ্টি হোক

শুধু না ভেজে যেনো তোমার চোখ...

Comments